একথায় সন্দেহ নাই, বাংলা সমাজ আজ এক দ্বিধাগ্রস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বহমান আধুনিকতার বহ্নিপ্রবাহ, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অবক্ষয়। প্রযুক্তির বিস্তার আমাদের জীবনে বিপুল সুবিধা আনিয়াছে, কিন্তু একইসঙ্গে লোপ পাইতেছে অন্তর্গত শিকড়, যাহার উপর ভর করিয়া একদা গড়িয়া উঠিয়াছিল জাতির আত্মপরিচয়।
সমাজে এখন বহুলভাবে দেখা যায়—বাহ্যিক জৌলুসে মত্ত গম্ভীর সম্প্রদায়, যাহারা আপন দৃষ্টি উচ্চাভিলাষের দিগন্তে স্থাপন করিয়া তথাকথিত সামান্য বিষয়কে অবজ্ঞার অগ্নিতে দগ্ধ করিতেছে। কিন্তু প্রশ্ন হইল, ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার সংরক্ষণ ব্যতীত বৃহৎ ঐতিহ্যের অস্তিত্ব কোথায়? যে জাতি আপন অতীতের ক্ষুদ্রতম অভ্যাসকে ধারণ করিতে জানে না, তাহার কাছে ইতিহাসের মহিমা শূন্য মরীচিকা ব্যতীত আর কিছু নহে।
বিশ্বের বিদ্বান সমাজ জানে—সাধারণ মানুষের জীবনকথা, প্রাত্যহিক আচার, গৃহস্থালির গাথা, অন্তঃপুরের অনুক্ত বাণী—এসবই হইতেছে ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের গুপ্ত ভান্ডার। ইউরোপের গবেষকগণ গ্রাম্যছড়া, প্রবাদ, প্রাচীন ব্রতসংগীতকে লিপিবদ্ধ করিয়া বিশ্বপাণ্ডিত্যকে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। তাঁহারা বোঝেন, লোকজ স্মৃতি মানে জাতির মর্মকোষ। আর আমাদের দেশে আজও এই কর্মপ্রচেষ্টা প্রায় অনুপস্থিত।
আমাদের দায়িত্ব স্পষ্ট—অতীতের ক্ষুদ্র স্বরলিপি সংরক্ষণ করা। আধুনিক কালের দৌড়ঝাঁপের মাঝেও সময় এসে গেছে অন্তত কিছু মানুষকে এ কাজে আত্মনিয়োগ করিবার। বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় যদি কেবল তত্ত্ব ও পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর কখনো খুঁজে পাইবে না সেই সজীব আত্মপরিচয়, যাহা গড়িয়া তুলিয়াছিল এ সমাজকে।
আজ যাহা অবজ্ঞাত, কাল তাহাই হইবে ইতিহাসের একমাত্র প্রামাণ্য দলিল। অতএব প্রয়োজন এক নবচেতনার, যাহা জাতিকে শিখাইবে—ক্ষুদ্রের ভেতরেই মহৎ, অবজ্ঞাতের ভেতরেই সত্য। অন্যথায়, এই সমাজ কেবল যান্ত্রিক অগ্রগতির কোলাহলে বিলীন হইয়া যাইবে, কিন্তু রেখে যাইবে না আত্মার কোনো চিহ্ন।
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫