মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রতিরোধের প্রবণতা কখনো নতুন কিছু নয়। আঘাত পেলে প্রতিসাম্যের খেলা খেলতে মানুষ প্রলুব্ধ হয়—কিন্তু এ খেলার শেষ নেই। প্রতিশোধ ক্ষণিক তৃপ্তি দেয় বটে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা কেবল নতুন ক্ষত তৈরি করে। এসব দিকে, প্রতিশোধকে কোন একক শক্তির প্রকাশ হিসেবে মনে করি না বরং প্রতিশোধকে বলা যেতে পারে অন্তর্গত দুর্বলতার স্বীকারোক্তি।
সভ্যতার অগ্রযাত্রা সম্ভব হয়েছে তখনই, যখন মানুষ প্রতিশোধের শৃঙ্খল ভেঙে ক্ষমার বোধে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমাকে দুর্বলতার কোন সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখিনা। ক্ষমা উচ্চতর বৌদ্ধিক সিদ্ধান্ত। অন্যায়কে নাকচ করে দেওয়া, কিন্তু ঘৃণাকে না বাড়িয়ে শান্তির পথ নির্মাণ করাই ক্ষমার আসল তাৎপর্য। হান্না আরেন্ট লিখেছিলেন—’ক্ষমা হলো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি থামিয়ে দেওয়ার একমাত্র মানবিক কৌশল।’
সমাজতত্ত্ব বলে—প্রতিশোধ সংস্কৃতি মানুষের ভেতরে স্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি করে। তুলনা, প্রতিযোগিতা আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন প্রতিটি সম্পর্কে প্রবেশ করে, তখন অন্যের সাফল্য হয়ে ওঠে আমার হিংসার কারণ। অথচ মানবজীবনের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় না প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক’ধাপ উপরে ওঠা দিয়ে, বরং নির্ধারিত হয় সে কতটুকু শান্তি ছড়াতে পেরেছে তার দ্বারা।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় প্রতিশোধ মানে অবদমিত বেদনাকে বহির্প্রকাশ করা, কিন্তু এর দ্বারা আত্মশুদ্ধি ঘটে না। বরং সেই বেদনা আরও গভীরভাবে ভেতরে জমে থাকে। বিপরীতে ক্ষমা হলো আত্মমুক্তি—একটি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষ নিজেকে মুক্ত করে বিষের দংশন থেকে।
ফুকো বলেছিলেন—ক্ষমতা ছড়িয়ে আছে প্রতিটি সম্পর্কে, প্রতিটি দেহে। প্রতিশোধ সেই ক্ষমতার নৃশংস রূপকে তীব্র করে তোলে, আর ক্ষমা তাকে প্রতিসাম্যের বাইরে গিয়ে নতুন অর্থ প্রদান করে। আর ক্ষমা মানে অন্যায়কে অনুমোদন দেয়া বিষয়টা একদমই না; বরং অন্যায়ের বিপরীতে সহিংসতাহীন প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
শেষ পর্যন্ত মৃত্যু আমাদের সবার অপেক্ষায় আছে। মৃত্যু যখন নিশ্চিত, তখন প্রতিশোধ বহন করা মানে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত শত্রুতা টেনে নিয়ে যাওয়া। অথচ মৃত্যুর আগে যদি ক্ষমা করা যায়, তবে মানুষ নিজেই হয়ে ওঠে হালকা, নির্মল, মুক্ত।
ইতিহাস ভুলে যায় সম্পদ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি। ইতিহাস মনে রাখে—কে অশান্তি রেখে গেছে, আর কে শান্তির প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে গেছে।