সত্যপথ অন্তরলোকের গভীরতম অধ্যায়ে প্রজ্জ্বলিত, যাহার দীপ্তি মহাকালের মহাসংগীতে অনুরণিত, যাহা ভ্রান্তি-নিরাসনকারী, অন্ধকার-বিধ্বংসী ও মোহ-মায়ার গ্রন্থি-বিচ্ছেদকারী। যুগের পর যুগ, শতকের পর শতক যাহারা সত্যপথে অবিচল রহিয়াছে, তাহারাই অসত্যের অঙ্গার জ্বালাইয়া আলোকের জয়গান গাহিয়াছে, তাহারাই শূন্যতায় সৃষ্টি ঘটাইয়া মহাসত্যের স্তম্ভ স্থাপন করিয়াছে, তাহারাই প্রতিকূলতার বিপুল বন্যা অগ্রাহ্য করিয়া ন্যায়ের অটল সেতু নির্মাণ করিয়াছে। সত্যপথ সেই পথ, যাহা দুর্গম, যাহা কণ্টকময়, যাহা শোষকের বিরোধিতায় বিদীর্ণ; সত্যপথ সেই পথ, যাহা বহুজন বর্জন করিলেও অবশেষে মহাজীবনের একমাত্র আশ্রয়স্বরূপ প্রতীয়মান হয়।
সত্যপথ সেই পথিকের, যাহার অন্তরপ্রদীপ নিভিয়া যায় নাই, যাহার বিশ্বাস অটল, যাহার চেতনায় দুর্নিবার দীপ্তি, যাহার সংকল্প শিলাসম কঠিন, যাহার আত্মশক্তি দুর্জয়, যাহার দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী। যে ব্যক্তি সত্যপথে অবিচল, সে কখনো ভ্রান্তির মায়ায় নিমজ্জিত হয় না, সে কখনো আত্মপ্রবঞ্চনার অতল গহ্বরে পতিত হয় না, সে কখনো লোভের অগ্নিকুণ্ডে আত্মা বিক্রয় করে না; বরং সে প্রতারণার প্রলোভন ছিন্ন করিয়া, কুটিলতার আবরণ উদ্ঘাটন করিয়া, অসত্যের মুখোশ উন্মোচন করিয়া, মহাসত্যের দিকে দুর্বার গতিতে ধাবিত হয়। সত্যপথ সেই মহামন্ত্র, যাহা আত্মার দুর্বলতা বিলুপ্ত করিয়া অন্তরের শুদ্ধি আনয়ন করে; সত্যপথ সেই অভিজ্ঞান, যাহা মনুষ্যত্বের প্রকৃত রূপ উন্মোচন করে; সত্যপথ সেই সংহতি, যাহা জাতিকে একত্রিত করে, সভ্যতাকে দৃঢ়তা দেয়, মানবতাকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করে।
সত্যপথ কখনো সুগম নহে; যাহার প্রাঙ্গণে দুর্বল হৃদয় ভগ্ন হয়, যাহার দ্বারে লোভী, ভীরু ও সুবিধাবাদীগণ প্রবেশাধিকার পায় না, যাহার চৌহদ্দিতে কপটতার কোনো স্থান নাই। এই পথে চলিবার জন্য চাই দৃঢ় সংকল্প, চাই আত্মশক্তির মহাসঞ্চয়, চাই ধৈর্য ও অধ্যবসায়, চাই সকল প্রকার প্রলোভনের বিরুদ্ধে দুর্জয় প্রতিরোধ। যে ব্যক্তি সত্যপথে চলিতে চায়, তাহাকে প্রথমেই আত্মজিজ্ঞাসার সম্মুখীন হইতে হয়, তাহাকে তাহার অন্তর্জগতের অন্ধকারকে দূর করিতে হয়, তাহাকে নিজ অন্তরে সত্যের দীপ প্রজ্জ্বলিত করিতে হয়। সত্যপথ সেই পথ, যাহা বাহিরের জগৎকে পরিবর্তন করে, যাহা সমাজের মিথ্যাচার দূর করে, যাহা রাষ্ট্রকে ন্যায়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে, যাহা সমগ্র বিশ্বকে এক মহাসত্যের পথে পরিচালিত করে।
সত্যপথে চলিলে প্রতিকূলতা আসিবেই, মিথ্যার দুষ্টচক্র বাধা দিবেই, অসত্যের জটিল ফাঁদ সত্যসন্ধানীর পদরোধ করিবার চেষ্টা করিবেই; কিন্তু যে ব্যক্তি সত্যপথে চলিবার শপথ গ্রহণ করে, সে কোনো বাধাকে পরোয়া করে না, সে কোনো শাসকের রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না, সে কোনো লোভনীয় মোহের দ্বারা বিভ্রান্ত হয় না। ইতিহাসে যত মহামানব সত্যপথে চলিয়াছে, তাহাদের সকলকেই কঠোর পরীক্ষা সহ্য করিতে হইয়াছে, সকলকেই প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হইতে হইয়াছে, সকলকেই প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে আপন দীপশিখা রক্ষা করিবার সংগ্রাম করিতে হইয়াছে; কিন্তু শেষপর্যন্ত তাহারাই বিজয়ী, তাহারাই অমর, তাহারাই চিরস্মরণীয়।
সত্যপথ কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতার প্রশ্ন নহে, ইহা জাতীয় উত্থানের মূলমন্ত্র, সামষ্টিক মুক্তির অনিবার্য শর্ত। যে সমাজ সত্যপথ হইতে বিচ্যুত হয়, তাহা অবশেষে আত্মবিনাশের গভীর খাদে পতিত হয়; যে জাতি সত্যপথ ত্যাগ করে, তাহার কপালে চূড়ান্ত পরাজয় ও অধঃপতন অমোঘ নিয়তি হইয়া দাঁড়ায়। ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়সমূহে যাহারা মিথ্যা, প্রবঞ্চনা ও ক্ষমতার লালসায় নিমজ্জিত হইয়াছে, তাহারা কালের গর্ভে বিলীন হইয়াছে; কিন্তু যাহারা সত্যপথে অবিচল থাকিয়াছে, তাহারাই যুগে যুগে মহাকালের পৃষ্ঠায় আপন নাম খোদাই করিয়াছে। সত্যপথে প্রতিষ্ঠিত হইলে ব্যক্তিগত উন্নতি যেমন অনিবার্য, তেমনই জাতীয় সাফল্যও অবধারিত।
সত্যপথ তাহাই, যাহা মানুষকে মোহমুক্ত করে, যাহা ব্যক্তি ও জাতিকে আত্মপ্রবঞ্চনার অভিশাপ হইতে রক্ষা করে। যে সমাজ সত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, তাহার ভিত্তি কখনো নড়বড়ে হয় না; যে রাষ্ট্র সত্যপথকে আলিঙ্গন করে, তাহা কখনো পতনের সম্মুখীন হয় না; যে ব্যক্তি সত্যপথকে জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা হিসাবে গ্রহণ করে, সে কখনো বিভ্রান্ত হয় না। আজ পৃথিবীর সকল অস্থিরতা, সকল সংকট, সকল অবক্ষয়ের মূলে সত্যপথ হইতে বিচ্যুতি। মিথ্যা, প্রতারণা ও স্বার্থপরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হইয়া মানুষ সত্যপথের দ্যুতিকে বিস্মৃত করিয়াছে এবং এই কারণেই বিশ্বজুড়ে অশান্তি, অবিচার ও অধঃপতন।
সত্যপথই একমাত্র পথ, যাহার মাধ্যমে মানুষ আপন সত্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটাইতে পারে; সত্যপথই একমাত্র শক্তি, যাহার দ্বারা জাতির পুনরুত্থান সম্ভব; সত্যপথই একমাত্র আশ্রয়, যাহার আলোতে সভ্যতা টিকে থাকে, সমাজ আলোকিত হয়, রাষ্ট্র সমৃদ্ধ হয়। অতএব, সত্যপথ হইতে বিচ্যুত হইলে আত্মবিনাশ অনিবার্য, সত্যপথ হইতে সরে গেলে জাতির পতন অনিবার্য, সত্যপথ পরিত্যাগ করিলে সভ্যতার অবক্ষয় অবশ্যম্ভাবী। এখনো যদি সত্যপথে চলিবার আহ্বান হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত না হয়, তবে চিরকাল অন্ধকারেই নিমজ্জিত থাকিতে হইবে; কিন্তু যদি সত্যপথের মন্ত্র হৃদয়ে স্থান পায়, তবে জাগরণ অবশ্যম্ভাবী, উত্থান অনিবার্য, চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত।
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ঢাকা।